| 18 এপ্রিল 2024
Categories
প্রবন্ধ সিনেমা

আক্রমণ করলাম  সত্যজিৎ  রায়কে ।  দিলীপ মজুমদার

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

আলাপ-পরিচয় না থাকলেও কোন কোন মানুষকে ভালো লেগে যায়। নির্মাল্য আচার্য সেই রকম এক মানুষ। আমি থাকতাম সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটের এক মেসে। কলেজ রো দিয়ে যেতে প্রায়ই দেখতাম নির্মাল্য আচার্যকে। সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরা সৌম্য মানুষ। বগলে একতাড়া কাগজপত্র নিয়ে ধীরগতিতে হাঁটতে হাঁটতে উঠতেন কফি  হাউসে। সেখানে বসই প্রুফ দেখতেন ‘এক্ষণ’ পত্রিকার। তিনি ছিলেন পত্রিকার সম্পাদক। ১৯৬১ সালে এই উন্নতমানের দ্বি-মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। যুগ্ম সম্পাদক, অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে নির্মাল্য আচার্যের যোগাযোগ ঘটিয়ে দেন। পত্রিকার নামকরণও করে দেন সত্যজিৎ রায়। পত্রিকার প্রচ্ছদও তিনি আঁকতেন। সত্যজিতের বহু চিত্রনাট্য প্রকাশিত হয় এই পত্রিকায়।

সত্যজিৎ রায় মারা যান ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল।  ১৯৯৬ সালের শেযের দিকে রায় পরিবার থেকে এক অভিযোগ করা হয় নির্মাল্য আচার্যের বিরুদ্ধে। নির্মাল্য আচার্য নাকি সত্যজিতের বহু মূল্যবান সম্পদ আত্মসাৎ করেছেন। তখনকার বামফ্রন্ট সরকার তদন্তের নির্দেশ দেন পুলিশকে। এই ঘটনার প্রতিবাদ করে ‘আজকাল’ পত্রিকায় সাহিত্যিক দেবেশ রায় একটি প্রবন্ধ লেখেন। প্রবন্ধটি পড়ে আমি উত্তেজিত হই। ক্রোধে অন্ধ হয়ে  ‘আজকালে’ একটি চিঠি লিখি। সে চিঠিতে আমি সত্যজিৎ রায় ও তাঁর পরিবারকে আক্রমণ করি। চিঠিটি এইরকম  :

                                    সত্যজিৎ রায়  : একটি  অন্যমত

“আজকালে’  দেবেশ রায়ের ‘নির্মাল্যের সম্মানের পুনরুদ্ধার চাই’  ( ১৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৬) লেখাটি পড়ে তৃপ্তি পেলাম। ‘সত্যজিৎ’ নামক মোহাবেশের বিরুদ্ধে যুক্তি-বুদ্ধির প্রতিবাদ ক্ষীণ হলেও ধ্বনিত হয়েছে ওই লেখায়। দেবেশ রায়কে ধন্যবাদ। সম্মান সকলেরই আছে। একজনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মাদকতা যখন আর একজনকে অসম্মানিত করার নির্বিচার অধিকার পায়, তখন তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মানবিক কর্তব্য। আর তিনি ঠিক তাই করেছেন। সত্যজিতের সম্পদ উদ্ধারের জন্য পুলিশবাহিনীর ফের তৎপরতা দেখা গেল। আমাদের দেশের ইতিহাসে ঘটনাটি তুলনাবিহীন। রবীন্দ্রনাথের সম্পদ উদ্ধারের জন্য তো এমন তৎপরতা দেখা যায় নি।  ঋত্বিক ঘটক, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, উত্তমকুমার, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, নিশীথরঞ্জন রায় প্রমুখের ‘সম্পদ’ উদ্ধারের জন্য আদৌ কোন মাথাব্যথা আছে বলে তো মনে হয় না। তাহলে কী সত্যজিৎ রায় এঁদের সকলের অনেক উঁচুতে? তিনি এক, একক তথা অদ্বিতীয়?

“প্রধানত সত্যজিৎ রায় একজন চলচ্চিত্রকার। সন্দেহ নেই বাংলা চলচ্চিত্রকে সাবালক করেছেন তিনি। এছাড়া কিছু সেরা প্রচ্ছদ এঁকেছেন, বেশ কিছু গোয়েন্দা বই লিখেছেন, চলচ্চিত্রের উপর প্রবন্ধ ও প্রবন্ধগ্রন্থ লিখেছেন। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে তাঁর সম্পর্কে যে বল্গাহীন প্রচার চলছে, যে উচ্ছ্বাসময় প্রশস্তি দেখা যাচ্ছে তার কি কোন তুলনা আছে? সাম্প্রতিককালে কোন শিল্পী বা মনীষী কি এরকম উচ্ছ্বাসে অভিষিক্ত হয়েছেন? কেউ বললেন, ঘরের জানালা দিয়ে বিশ্বদর্শন করেন তিনি। কেউ বললেন বাংলা সাহিত্যে তাঁর অক্ষয় কীর্তির কথা। কারো মতে  তিনি চিত্রে-সংগীতে নব যুগ প্রবর্তক। কেউ যুক্তি দেখালেন যশস্বী লেখকের লেখাকে চলচ্চিত্রে বদলে ফেলায় তাঁর জুড়ি নেই। উচ্ছ্বাস যখন বল্গাহীন তখন আর কোন কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। সত্যজিৎ হয়ে উঠলেন সর্বশক্তিমান—‘তোমার পায়ের পাতা সবখানে পাতা / কোনখানে রাখব প্রণাম!’

“কিন্তু যাঁরা এসব বললেন, তাঁরা কারা? সাধারণ মানুষ কি? সত্যজিৎ কি জনগণমননন্দিত? উত্তম-হেমন্তকে সধারণ মানুষ যতটা নিজের বলে মানেন, এই বিশ্ব পরিচালককে ততটা চেনেন না। সরকার ও রাজনৈতিক দল সত্যজিৎকে ‘ইস্যু’ হিসেবে ব্যবহার করলেন। এখনকার রাজনীতি যে ইস্যু-সন্ধানী। ‘সত্যজিৎ আমাদের সঙ্গে আছেন’–  এই ভাবটি প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তাঁর প্রচার করতে হবে। তাঁর ভাবমূর্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও ভাবমূর্তি বাড়বে। এই ইস্যুহান্টিং পলিটিকসের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়ে সত্যজিৎ তাঁর জীবৎকালে  এবং মৃত্যুর পরে এতাবৎ যা পেয়েছেন  (নগদ অর্থ + পদ + পদক + শংসাপত্র + প্রচার) তা কি তাঁর প্রকৃত প্রাপ্যের চেয়ে অনেক বেশি নয়? যদি কেউ বলেন, ধরাধরি নেই, সূর্যের মতো তিনি  স্বতঃ উজ্জ্বল বলে তাঁর প্রাপ্তি স্বতঃস্ফূর্ত—তাহলে বলতে হবে যে তিনি অসত্য বললেন। পদ ও পদকের পেছনে যে রাজনীতির কাণ্ডারীদের হাত থাকে, এ যুগের বাচ্চাও সে কথা জানে।

“সত্যজিৎ গুণী পরিচালক। কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পকে কতটুক জীবনীশক্তি দিয়ে গিয়েছেন তিনি? এই শিল্পের  সমস্যা দূরীকরণে কতটুকে তাঁর অবদান? দু-একজন ব্যতীত তাঁর সঙ্গে জড়িত সব শিল্পী ও কলাকুশলী কি উপযুক্ত পারিশ্রমিক পেতেন? ওই যে তাঁর নামে প্রচলিত আছে ‘আমার ছবিতে কাজ করছেন,এটাই তো সবচেয়ে বড় পারিশ্রমিক’ এ কথা কি মিথ্যে?

“দেবেশ রায় নির্মাল্যবাবুর বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে রায় পরিবারের ভূমিকা ও রায় পরিবারের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বোঝাপড়ার ব্যাপারটির উপর আলোকপাত করার দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু তার কি কোন দরকার আছে? সরকারই তো রায় পরিবারের উচ্চাকাঙ্খাকে দিগন্তস্পর্শী হতে দিয়েছেন। জীবিত ও মৃত সত্যজিৎকে তাঁরা এমনভাবে আঁকড়ে ধরেছেন যাতে মনে হয়, জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবে অগ্রণী সৈনিকের ভূমিকা পালন করতেন তিনি। কায়মনোবাক্যে তিনি কি কখনও গণ-আন্দোলনের শরিক হয়েছেন? ব্যক্তিগত স্বার্থকে বিপন্ন করে স্বৈরাচার ও ভ্রষ্টাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন? তাঁর কোন লেখায় দেশের শোষক ও অত্যাচারীর বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ আছে? দেশের ও সাধারণ মানুষের কোন বিপদের সময় তিনি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন? বরং তাঁর উন্নত মেধার সঙ্গে সুবিধাবাদের সংযোগটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সত্তরের দশকে জ্যোতি বসু ও তাঁর দল যখন আক্রান্ত হচ্ছে, তখন কি একবারও গজদন্তমিনারের বাইরে এসে প্রতিবাদ করেছেন অথবা ‘কলকাতা-৭১’এর মতো কোন ছবি? সরকার সত্যজিৎকে ব্যবহার করছেন, না নিজেরাই ব্যবহৃত হচ্ছেন, সে এক বিষম গোলকধাঁধা।

“অবমূল্যায়ন ও ভক্তির অতিরেকের মাঝে সমালোচনার ভূমিকা। সে সমালোচনার জন্য প্রয়োজন অপক্ষপাত, অনাসক্ত বৈজ্ঞানিক মন ও মনন। সত্যজিতের যথাযথ মূল্যায়ন  ও সমালোচনা হোক, সেটাই আমাদের কাম্য। তাঁর প্রতি অন্ধভক্তির (অন্ধ নাকি স্বার্থবুদ্ধিপ্রণোদিত !) উচ্ছ্বাসে নির্মাল্যবাবুদের মতো আর কারোকে যেন অপমানিত না করা হয়।’’

(আজকাল)


আরো পড়ুন: দড়ি ধরে মারো টান


আমার এই চিঠি প্রকাশিত হবার পরে প্রায় মাসখানেক ধরে পত্রিকাটিতে নানা প্রতিবাদপত্র প্রকাশিত হয়। বেশিরভাগ চিঠিতে আমাকে তীব্র সমালোচনা করা হয় আমার মূর্খামির জন্য। এতবড় একজন মানুষের সমালোচনা করাটাই অন্যায় বলে মত দেন পত্রলেখকরা। কিন্তু আমার প্রশ্নগুলির সদুত্তর কেউ দেন নি। যেমন, সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পারিশ্রমিকের প্রশ্ন,  গণান্দোলনে তাঁর ভূমিকার প্রশ্ন, তখনকার সরকারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের প্রশ্ন ইত্যাদি। তখন বয়স কম ছিল, তাই হিতাহিত জ্ঞান ছিল না। তা না হলে এটা বোঝা  উচিত ছিল যে, নির্মাল্য আচার্যকে সত্যজিৎ রায় কোন অপমান করেন নি, করেছেন তাঁর পরিবার। অথচ আমি আক্রমণ করেছি সত্যজিৎ রায়কে। নিজের অবিমৃশ্যকারিতায় পরিণত বয়সে লজ্জা হয়। তবে এটা আমি বিশ্বাস করি যে, আজও আমাদের দেশে নিন্দা অথবা প্রশংসা হয়, যথার্থ সমালোচনা হয় না। আর একটা কথা ভেবে আত্মপ্রসাদ লাভ করি। এই প্রতিভাশালী মানুষের নিন্দুক হিসেবে ইতিহাসে আমার একটা স্থান হবে।

One thought on “আক্রমণ করলাম  সত্যজিৎ  রায়কে ।  দিলীপ মজুমদার

  1. অনুভব তখন আবেগের মোহবর্তী হবে, যখন ধান্দার আখরায় সকলে ভজন গাইবে। আপনার উপলব্ধি পরিণত বয়সে পরিবর্তন হয়েছে। সেটাই স্বাভাবিক। আপনি স্বীকার করেছেন, সেটাই সৌজন্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধুসূদনের কাব্য সমালোচনার প্রেক্ষিত একটি দৃষ্টান্ত। ১৪ বছর বয়সের ভাবনা তিনি ৪২ বছর বয়সে এসে পরিবর্তন করেছিলেন।
    আমাদের পাবলিসিটি নামক একটা বিরল রোগ আছে। আর সেখানেই ঘেঁষে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অভ্যাস হয়ে গেছে। যথাকে যথার্থ বলা বা অসদকে অহেতুক বলার রেওয়াজ কম। ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত