ছিটকানিটা লাগাই না

সহধর্মিণী হলুদ কাপড়ে হলদে বোনাপাখি হয়ে বলল,

— হ্যা গো, মুখটা তো বেশ জিতাবাবু জিতাবাবু লাগছে।
হারাবাবু পুলকেশ চাউনি হেনে বললেন,— ‘হেঁ হেঁ, নাতি-টোটকা।’
মাত্র দেড় বছর বয়স, এখন দাদুর কোলে শুয়ে পা ছুঁড়ছে। বউমা চায়ের সরঞ্জাম এনে টেবিলে রাখল।দাদুর কোল থেকে ছেলেকে তুলে নিতে নিতে বলল— এছো ছোনা, ছকাল থেকে দাদুকে জ্বালাতে নেই।
হারাবাবু বললেন

— থাকুক না। চা-টা আমি সাবধানে খেয়ে নেব।
— না বাবা, ধীরে সুস্থে খান।
হারাবাবু টেবিল থেকে কাপ তুলে নিয়ে মুখে একটা কৃত্তিম শব্দ করলেন। দাদুভাই ঠিক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েছে। হারাবাবু হাসতে হাসতে বললেন

— বউমা, দুষ্টুটার বুদ্ধিশুদ্ধি হবে বলে মনে হচ্ছে।
বউমা হেসে বলল

— দাদুভাই এর তো সব কিছুই ভান আপনার।
শাশুড়িমা’র কাছে জানতে চাইল

— মা,আজ কী তরকারি করি বলুন তো? 
শাশুড়িমা হেসে বললেন

— সামু কী আনে দেখো।
বউমা নীচে নেমে গেল।
হারাবাবু চায়ের কাপটা টেবিলে নামিয়ে বললেন

— হারাবাবু থেকে জিতাবাবু হয়েছি তো?
সহধর্মিণী বললেন

—দাদুভাই আসার পর থেকেই দেখছি, কপালের ভাঁজটা আর সেভাবে পড়ছে না। 
হারাবাবু আনন্দের সঙ্গে বললেন

— এই যাও যাও, প্রেসারের ট্যাবলেটটা নিয়ে এসো।
ট্যাবলেট গিলে নিয়ে বললেন

—পুজোর ছুটিতে বউমা এখানে থাকবে তো?
বউমা স্কুলে পড়ায়, ছেলে বেসরকারি অফিসে চাকুরে।
গৃহিণী বললেন

— কী জানি বাপু, সামুকে বলে দেখবে একবার।
—ও যদি সবগুলোকে নিয়ে চলে যায় তাহলে তোমাকেও তো যেতে হবে।
—দেড় বছর ধরে সেটাই তো চলছে। তুমিও আমাদের সঙ্গে চলো না। এখানে একা একা পড়ে থাকো। আবজা-গবজা কি খাও কে জানে।
কখন এসে পড়েছে ভাইজি সোনাই। ওরা খেয়াল করেনি।
জ্যাঠাইমা বলল

— পড়াশোনা মন দিয়ে করছিস তো? এস.এস.সি’র জন্য আপ্রাণ চেষ্টা কর।
সোনাই ঠোঁট ওল্টালো

— জ্যাঠাইমা যেটা বলতে এলাম।
কেটে কেটে বলল সোনাই

—সেদিন রাত্রে ওপরে এসে দেখছি জেঠু দরজায় ছিটকিনি না লাগিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে।
গৃহিণী বললেন

— ছিটকিনি লাগাতে এত কষ্ট?
সামু বাজার থেকে ফিরল। দেখল, বাবা-মা সোনাই বসে আছে।
সামু বলল

— বাবা ওষুধপত্তর ঠিকঠাক খাচ্ছে তো? মা’ও এখন থাকতে পারে না। তুমি যে কি করছ চিন্তা হয়।
হারাবাবু উৎফুল্ল হয়ে বললেন

— তোর তো পুজো, কদিন ছুটি। বউমার স্কুল খুলতে সেই কালিপুজো। মাসখানেক বউমা এখানেই থাকুক না।
—সেটা তো ওকে বলেছিলাম। ও বাপের বাড়িতে কয়েকটা দিন থেকে, ওখান থেকেই হাওড়া ফিরবে বলছে।
হারাবাবু ম্লান হেসে বললেন — ‘ও’।
এই ফাঁকে সোনাই চেঁচিয়ে উঠল

— জানিস দাদা, জেঠু না রাত্রে ছিটকিনি না লাগিয়েই ঘুমিয়ে যায়।
হারাবাবু হো হো করে হাসলেন

— না রে ইচ্ছে করেই দিই না। 
ততক্ষণে বউমা রাখি এসে পড়েছে। সামু চেঁচিয়ে উঠল

— এই রাখি, শুনলে বাবার কান্ড।
রাখি বলল

— তাতে কি? চোর ডাকাতের তো ভয় নেই।
হারাবাবু মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন

— বউমা ঠিক ধরেছে, তোরা সব মূর্খ। এবার বউমার দিকে তাকিয়ে বললেন

— তুমি ঠিক ধরেছ, স্কুলে পড়াও তো।
এবার সামুর দিকে তাকিয়ে বললেন

— ধর, আমি রাত্রে ঘুমের ভেতর মারা গেলাম। বেলা হয়ে গেলেও দরজা খুলছি না। পাড়ার লোক জড়ো হবে। দরজা ভাঙবে। কী দরকার দরজা ভাঙার? টুক করে ঠেলে দিলেই খুলে যাবে।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত