| 21 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
উপন্যাস ধারাবাহিক সাহিত্য

ধারাবাহিক উপন্যাস: খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি (পর্ব-৬)

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

আমার কাছে বাবার এই অকপট স্বীকারোক্তির পরে সবকিছুই অন্যরকম হয়ে গেল।

বাবা কেমন যেন লাপরোয়া হয়ে গেল। একেবারে যেন নিশ্চিন্ত ভাবনাহীন। আগে মায়ের সব কথাতেই বাবাকে হম্বিতম্বি করতে দেখা যেত না। মাঝে মাঝে চুপ করেও থাকতে দেখেছি। কিন্তু এখন যেন মাকে আর পাত্তাই দেওয়ার দরকার নেই তার! এতদিন বুঝিনিজের এই ‘কীর্তি’ টুকুই প্রকাশ করে ফেলার প্রয়োজন বাকি ছিল। আমার কাছে প্রকাশ করে ফেলেই তার যাবতীয় গরজ বালাইয়ের দায় চুকেবুকে গেছে।

মা-বাবা দুজনেই দুজনের দিকে একটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি লাগিয়ে রাখে সারাক্ষণ। কে কী করছে, কে কীভাবে কথা বলছে, কোথায় যাচ্ছে কার সাথে কথা বলছে…কিছুই আরেকজনের নজর এড়ায় না। মানিজেও যে বাবার ব্যাপারটা লক্ষ করেছে, বুঝতে পারলাম। আমি হয়েছি তাদের দুজনের ক্ষোভ ছড়ানোর মাধ্যম।

এক ছুটির দিনে বিকেলে বাবাকে সেজেগুজে বের হতে দেখেই মা আমাকে চেপে ধরলো।

‘নীরা, তোর বাবা তো দেখি তোর সাথে অনেক গুজুরগুজুর করে। কী হয়েছে উনার? সাজপোষাকের বহর তো দেখছি ফুটে বেরুচ্ছে!’

আমি মুহূর্তেই সজাগ। কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হলো, আমার আর লুকোছাপা করার কী আছে? যার কীর্তি সেই যখন বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আমি তখন অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে কী করবো? আর তাছাড়া, মায়েরই তো খবরটা সবার আগে জানা প্রয়োজন! সামনে কী করবে, কীভাবে চলবে, বাবাকে ফিরিয়ে আনবে কেমন করে…এসব তো এখন মাকেই ভাবতে হবে!

কিন্তু বাস্তবতার সত্যিকারের রূপটা তখনো আমার কাছে পুরোপুরি প্রকাশিত হয়নি। যখন প্রকাশিত হয়ে পড়লো, তখন আর প্রস্তুতিটুকু নেওয়ার সময়টাও আর হাতে পেলাম না।

‘কীরে চুপ করে আছিস কেন? তুই জানিস না কিছু? নাকি আমার কাছে বলছিস না? বাপ বেটি এক জোট হয়েছিস নাকি?’

আমি মাথা নিচু করে চোখকান বন্ধ করে বলে ফেললাম, ‘মা…বাবার অফিসে একজন মেয়ে আছে। বাবার কলিগ, নাম ছন্দা। বাবা তাকে পছন্দ করে।’

আমি সেকেন্ডের হিসাব করতে লাগলাম। এক দুই তিন…। মা একদম চুপ। সময় যেন একেবারে থমকে আছে! পাক্কা কুড়ি সেকেন্ড কেটে যাওয়ার পরে মা মুখ খুললো, ‘এই কথা তোর বাবা বলেছে তোর কাছে?’

‘হুম। যেদিন সোহানুর আংকেল বাসায় এলো, সেদিন উনার আসার কথা ছিল। কী কাজে যেন আসতে পারেনি। পরে আসবে বলেছে।’

‘আচ্ছা…এসে সবাইকে উদ্ধার করবে! এসব নষ্টামি চলছে ভেতরে ভেতরে! তাই তো বলি…এত লাপরোয়া ভাব দেখাচ্ছে কেন? আর সাজগোজের কী বাহার! আহা! যেন যৌবন ফিরে পেয়েছে! উড়ুক উড়ুক… বেশি করে উড়ুক। তলাবিহীন ঝুড়ির আবার ফড়ফড়ানি! এত বড় সাহস! আমি এদিকে বসে বসে উদোরপিণ্ডি চটকাবো…আর উনি পাখি হয়ে আকাশে উড়বেন! একবার ছেড়ে দিয়েছিলাম…তাই বলে বারে বারে ছাড়বো?

দেখা যাবে কার দৌঁড় কদ্দুর! সে যদি বিল পাড়ি দেয়, আমিও সমুদ্র পাড়ি দিয়ে দেখাবো… আমার সাথে বাটপারি!…’


আরো পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস: খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি (পর্ব-৫)

মা আরো কী কী সব বলে যেতে লাগলো। আমি অবাক হয়ে মায়ের এমন ফড়ফড়ানি দেখছিলাম আর ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যাচ্ছিলাম। এরা কারা? আমার আর নয়নের স্নেহময় বাবা-মা? দিনের পর দিন এদেরই তো কথা ছিল, আমাদেরকে আগলে রাখার। সেই আশ্বাসেই তারা আমাকে আর নয়নকে এই পৃথিবীতে নিয়ে এসেছে।

অথচ এখন দুজনই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে নিজেদের অহং আরঅসততাকে প্রতিষ্ঠিত করার কাজে। দুজনের মধ্যে একটা কীসের যেন গুপ্ত প্রতিযোগিতা চলছে। দুজনেই দেখিয়ে দিতে চাইছে, কার দম কত বেশি! কে কার চেয়ে এগিয়ে থাকতে পারে! একটা অদ্ভুত অসুস্থ খেলায় মেতেছে দুজন! এই খেলা খেলতে গিয়ে নিজেদের সন্তানদের তারা কোন পথে ভাসিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, সেটা খেয়াল করাটা বুঝি তাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে না!

রাত নয়টার দিকে বাবা ফিরলো। বাবার চেহারার দিকে তাকাতে আমার নিজেরই লজ্জা লাগছে। ফুরফুরে মেজাজে উস্কোখুস্কো চুলে বাবা বুঝি স্বর্গের দুয়ার থেকে ফিরে এলো। সাজপোষাকে আজ অন্যরকম চেকনাই। এতদিন ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা বাবার আজ এই প্রথমবারের মতোই বুঝি বহিঃপ্রকাশ ঘটলো।

মা রাতে রান্নাঘরে ঢোকেনি। জানা কথা। আমি প্রস্তুত হয়েই ছিলাম। আগামিকাল আমার বায়োলজির একটা টেস্ট হওয়ার কথা আছে স্কুলে। আগেভাগেই পড়ে নিয়েছি। জানতাম আজকে আমাকেই রান্নাঘরে ঢুকতে হবে।

শুধু ভয় পাচ্ছিলাম বাবা ফিরে আসার পরে আজকে কী নাটকটা না জানি হয়! এতদিন তবু লাজলজ্জা আর আলগা সম্পর্কের খোলশটা পুরোপুরি খসে পড়তে পারেনি। আজ থেকে তো সেটুকুও আলগা হয়ে গেল!

কলিংবেলের আওয়াজ হতে আমিই দরজাটা খুলে দিলাম। বুকটা দুরু দুরু কাঁপছিল। মা আজ বিকেলের পর থেকেই নিজের ঘরে শুয়ে আছে। ছেলেমেয়ে দুটো কী করছে, কী খাচ্ছে, কেমন আছে…কিছুই যেন তার দেখার কথা নয়। মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবি, আমরা সত্যিই কি এই দুজন মানুষের আপন সন্তান? নাকি অন্য কারো সন্তানকে কুড়িয়ে নিয়ে এসে এরা ভারি বিপদে পড়ে গেছে! এখন না পারছে রাখতে…না পারছে ফেলে দিতে!

বাবা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে আড়চোখে আমার দিকে তাকালো। আশা করেছিলাম, সেই দৃষ্টির কোথাও হয়ত একটু কুন্ঠা জড়ানো থাকবে। ছিল কি? কই…আমার তো কিছু চোখে পড়লো না!

দুলকি চালে নিজের ঘরে ঢুকতেই মা একেবারে বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো বাবার ওপরে।

‘কী রাসলীলা সাঙ্গ হলো? কোথায় গিয়েছিলে দুজন? কোনো হোটেলে… নাকি তোমার ছন্দারাণির বাসাতেই সবকিছু হলো?’

‘মুখ সামলে কথা বলো। কার বাসায় বসে আছো, ভুলে যেও না। আমি এক নিমেষে তোমার অবস্থান দেখায়ে দিতে পারি…বুঝলে?’

‘কী! চোরের মায়ের এত বড় গলা! একবার সাবধান করে দিয়েছিলাম। তখন তো ইনিয়ে বিনিয়ে বলেছিলে শুধরে যাবে! এই শুধরানোর নমুনা? সংসারের প্রতি তোমার যদি কোনোই দায় না থাকে, তাহলে আমিও লাত্থি মারি তোমার সংসারের মুখে!’

কথাগুলো আমার কানের মধ্যে আগুনের গোলার মতো ছুটে আসছিল। মা আজ আবার এ কোন নতুন কথা তুললো? কীসের জন্য বাবাকে সাবধান করে দিয়েছিল মা? বাবা ইনিয়ে বিনিয়ে কী কবুল করেছিল? কিছুই তো বুঝতে পারছি না! বেশিকিছু চিন্তাও করতে পারছি না। সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে।

আজ বাসায় কী মাপের ঝড় বয়ে যাবে, সেটা আগেভাগেই আন্দাজ করে রেখেছিলাম। তাই নয়নকে অনেকটা জোর করেই পাশের বাসায় পাঠিয়েছি। ও যেতে চাইছিল না। কারণ আমাদের বাসার এসব নিত্য নৈমিত্তিক হৈ হল্লার জন্য আশেপাশের সবাই আমাদের দিকে কেমন যেন করুণার চোখে তাকায়। সেই চোখে সমবেদনা ফুটিয়ে তোলার প্রাণান্তক চেষ্টা থাকলেও বিদ্রুপ আর তাচ্ছিল্যটাই সবেগে ফুটে বের হয়। বন্ধুশ্রেণীয়রাও বড়দের দেখিয়ে দেখা রাস্তাতেই চলে। তারাও ফাঁকতালে বন্ধু হয়ে উঠতে পারে না।

আজ নয়নের কোনোরকম ওজর আপত্তিই কানে তুলিনি। কিছুতেই এই বিশ্রি ঝগড়ার মাঝখানে ওকে পড়তে দিতে চাইনি। আমি যে বয়সে এসে পৌঁছেছি, তাতে কিছুটা ভালোমন্দ হয়ত যাচাই করে নিতে পারবো…কিন্তু নয়নের পক্ষে কি সেটা সম্ভব?

মায়ের কথাগুলো যেন কানেই ঢোকেনি, বাবা এমনভাবে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে লাগলো।মা আবার হুংকার ছাড়লো,

‘কী কথা কানে যাচ্ছে না? কবে থেকে চলছে এসব?’

‘যেদিন থেকেই চালাই…তোমাকে বলতে আমি বাধ্য নাকি?’

‘আমাকে বলতে বাধ্য নও? আচ্ছা বেশ! তাহলে মেয়েকেই বলো। জন্ম দিয়েছো যখন, তোমারও তো কিছুটা দায়দায়িত্ব আছে! এ্যাই নীরা…আয় এদিকে আয়। বল, তোর বাবা কী কী বলেছে সব বল। আর যা যা বলেনি সেটাও শুনে নে তোর কীর্তিমান বাবার কাছ থেকে!’

আমার ইচ্ছে করতে লাগলো দরজা বন্ধ করে চোখদুটো বন্ধ করে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকি। প্রচণ্ড ক্লান্তি লাগছে। যে পিতামাতা নিজের সন্তানদের সামনে এমন কুৎসিত বাদানুবাদ চালিয়ে যেতে পারে, তাদের কাছে আমার আর কোনো প্রত্যাশাই নেই। আজ থেকে হয়ত মা-বাবার ঝগড়ার নতুন অধ্যায় শুরু হলো। কিংবা কে জানে, হয়ত এতদিনে সবকিছু পরিণতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় হলো!

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত