অনুপস্থিত নৈঃশব্দ্যের শক্তি চট্টোপাধ্যায়

আজ ২৫ নভেম্বর কবি, উপন্যাসিক, লেখক ও অনুবাদক, জীবনানন্দ-উত্তর যুগের বাংলা সাহিত্যের একজন প্রধান আধুনিক কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবারের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।


।। সুমন গুণ ।।

মৃত্যুর পরে, একজন লেখক দুভাবে পুনর্জীবিত হতে পারেন। ঠিকঠাক বললে তিনভাবে। বাংলা সাহিত্যের কয়েকজন লেখকের, আমাদের খুব চেনা কয়েকজন লেখকের কীর্তির পরম্পরা একটু মন দিয়ে বিবেচনা করলেই পুনর্জন্মের এই তিনটি স্তর আমরা টের পেতে পারি।

প্রথমে, ধরা যাক, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। জীবিতকালেই তিনি জনপ্রিয়তার যতটা অর্জন করা সম্ভব একজন আঞ্চলিক ভাষার লেখকের পক্ষে, তার শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিলেন। এমন তো হতেই পারে যে, এমন প্রবলভাবে বেঁচে থাকার পর, এখন, যখন তিনি শারীরিকভাবে নেই, ক্রমশ ধূসরতর হয়ে উঠলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-এর মতো লেখকের পক্ষে এভাবে হারিয়ে যাওয়া যদিও প্রায় অসম্ভব, কারণ নানাদিকে নানারকমে তিনি এমন উদারভাবে ছড়িয়ে ছিলেন যে, সবটা মিলিয়ে তাঁর একটা অতিমানবিক উপস্থিতি, বাংলা সাহিত্যে, বজায় আছে। তবু, ধরা যাক, কিছুদিন পরে, কিছুদিনের জন্য, তিনি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেলেন। আমরা তাঁকে নিয়ে আর লেখালেখি করলাম না। এভাবে বেশ কিছুদিন চলার পরেও এমন একটা সময় আসতে পারে, যখন আবার আস্তে আস্তে তিনি ফিরে এলেন আমাদের কাছে। নতুনভাবে। হঠাৎ। এই হঠাৎ ব্যাপারটা খুব রহস্যময়। এটা জোর করে হয়না। হয়না যে, তার তৎপর প্রমাণ বুদ্ধদেব বসু। বাংলা সাহিত্যে বুদ্ধদেব বসুর অবস্থান ঠিক হয়ে গেছে। গদ্যশিল্পী হিশেবে, বাংলা সাহিত্যের একটা পর্বের অভিভাবক হিশেবে, সম্পাদক হিশেবে তিনি স্থায়ী হয়ে গেছেন। এর বেশি কিছু হওয়া মুশকিল। সেটা বোঝা গেছে তাঁর জন্মশতবার্ষীকির সময় তাঁর কিছু নিকটজনের সক্রিয়তা দেখে। এত ‘কাজ’ করা হল, এত সেমিনার, এত বই, বক্তৃতা; কিন্তু বাংলা সাহিত্যে বুদ্ধদেব বসুর জায়গা যা ছিল, তার থেকে একটুও এদিক-ওদিক হয়নি। এভাবে হয়না যে!

পুনর্জীবিত হবার আরেকটা ধরন আছে। জীবিতকালে তেমন কোনো সম্মান পেলেন না এমন একজন লেখক মৃত্যুর পর অতিজাগতিক আকার নিয়ে বেড়ে উঠতে পারেন। এই প্রসঙ্গে সবচেয়ে প্রিয় উদাহরণটি আমাদের সবার জানা। যখন বেঁচে ছিলেন, সতীর্থদের মধ্যে সবচেয়ে করুণ অবস্থান ছিল তাঁর। বুদ্ধদেব বসুর আপ্রাণ লেখেলেখি সত্ত্বেও সেই নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তি ঘটেনি তাঁর। আর এখন! যত দিন যাচ্ছে, তাঁকে নিয়ে মশকরা করতেন তাঁর সমসাময়িক যে-কবিরা, জীববানন্দের থেকে প্রভাবে-প্রতিপত্তিতে তাঁদের দূরত্ব অনিবারণীয়ভাবে বেড়ে যাচ্ছে।

তৃতীয় আরেকটা ধরন আছে পুনর্জন্মের। সেটি তাৎপর্যের দিক থেকে ওপরে-বলা ধরন দুটি থেকে আলাদা। লেখক নিজে নন, তাঁর প্রভাব নিয়ে বেড়ে-ওঠা প্রজন্মের লালনে তিনি নতুনভাবে কখনো ফিরে আসতে পারেন।

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে, আমরা জানি, প্রথম আর তৃতীয় ধরনদুটি-ই প্রাসঙ্গিক। জীবিতকালে দারুণভাবে বেঁচে ছিলেন তিনি, এমনও বলা যায়, তাঁর সমসাময়িক লেখকদের তুলনায় অনেক প্রকাশ্যভাবে বেঁচে ছিলেন। কিছুটা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর এই সর্বস্ব নিয়ে বেঁচে থাকার তুলনা হতে পারে। বহরে সুনীলের বেচে থাকা অনেক বেশি বৈচিত্রপূর্ণ, কিন্তু তীব্রতায় আর আশ্লেষে শক্তির জীবন অনেক বেশি বর্ণময়। জীবিতকালে এই বর্ণময়তার উচ্ছ্বাস ছিল কূল-ছাপানো। তাঁর চলে যাবার পরে, স্বাভাবিকভাবেই, তা দ্রুত ফিকে হয়ে উঠল। স্মৃতিতর্পণের ঘনঘটা কমার পরপরই সেটা টের পাওয়া গেল। কিন্তু বলার কথা হল, জীবনাবেগের উদ্বেলতা নেমে যাবার সঙ্গে সঙ্গে তা নামিয়ে নিয়ে গেল শক্তির কবিতা নিয়ে চর্চার প্রবণতাও। শক্তি চলে যাবার পর, প্রাথমিক বিষাদ-বিহ্বলতা পর্বের পর, প্রায় এক দশক আমাদের সাহিত্যচর্চায় তাঁর কবিতা আমরা অনুপস্থিত নৈঃশব্দের মত টের পেয়েছি। অথবা এমনও হতে পারে, এত উদ্দীপনার সঙ্গে বেঁচে ছিলেন তিনি যে, তাঁর মৃত্যুর পর খুব স্বাভাবিকভাবেই সেই উদ্দীপনা উধাও হওয়ায় মনে হচ্ছিল যে বাংলা কবিতায় তিনি বোধহয় আর তত অপরিহার্য নন।

মনে হচ্ছিল, কিন্তু এটাও টের পাওয়া যাচ্ছিল যে, বাংলা কবিতায় শক্তি গভীরতর কোনো কারণে রয়ে যাচ্ছেন। সবটা পুরোপুরি বোঝা যাছিল না, কিন্তু তাঁর কবিতার এমন কোনো রসায়ন ছিল যা মাঝে মাঝে চলকে উঠে আমাদের সচেতন করে দিত। যখন আমরা পড়তাম, উদ্দেশ্যহীনভাবেই হয়তো, এমন অসম্ভব সব পংক্তি :

চাবি তোমার পরম যত্নে কাছে
রেখেছিলাম, আজই সময় হলো—
লিখিও, উহা ফিরৎ চাহো কিনা ?

শেষ কথাটির সনাতন পরাজয়ভঙ্গিটি থেকে এই কবিতা যেভাবে আবেগের ডানা মেলে দিল, নিঃশব্দে, অন্তত পড়বার সময় তাতে না মজে উপায় ছিলনা আমাদের।

উপায় ছিলনা শক্তির আরো কিছু লেখার মধ্যে যে অদৃশ্য রহস্যময়তা, আবেগের জটিল উথালপাথাল, তাকেও উপেক্ষা করার। অথচ, এই দুদশকে সবচেয়ে যাঁর লেখা নিয়ে কথাবার্তা হয়েছে, তিনি বিনয় মজুমদার। পঞ্চাশ থেকে মাথা উঁচু করে উঠে এসে এই ঠাকুরনগরনিবাসী কবি গত তিন-চারটি প্রজন্মকে প্রায় মুঠোর মধ্যে টেনে নিচ্ছেন। আরো সাংঘাতিক কথা হল, বিনয়ের মৃত্যুর পরে তাঁর এই আগ্রাসন বেড়েছে বই কমেনি। জীবনানন্দের পরে বিনয় মজুমদার হয়ে উঠেছেন আরেকজন আক্রমণাত্মক কবি, যাঁর যে-কোনো রচনার টুকরো দুর্লভ প্রত্নখণ্ডের মত আমাদের কাছে ধরা দেয়।

এই প্রভাব, অন্তত এর কাছাকাছি প্রভাব একসময় শক্তিরও ছিল। তিনি যখন বেঁচে ছিলেন, তখন। এখনও তাঁর কবিতা আমাদের সচেতন ভাবনার লক্ষ্য, কিন্তু তা অবলীলায় আর ঘটেনা। আমরা অনেকেই শক্তির কবিতা মন দিয়ে পড়ি, ছন্দের তীব্রতা আর আলোছায়াময় রঙিন কুহকে মজে যেতে যেতে আনন্দিত হই, একধরনের মায়া তাঁর কবিতা পড়ার পর আমাদের মনে জড়িয়ে থাকে। আমাদের মনে হয়, এই শাখাপ্রশাখাময় মায়ার খেলার রূপকার হিশেবে শক্তি বাংলা কবিতায় থেকে যাবেন। এমনিতে, পরের প্রজন্মের যে-কবিরা ক্রমশ স্থায়ী হচ্ছেন, তাঁদের কারো কারো মধ্যে শক্তি মাধুর্যের সংস্কার নিয়ে বেঁচে আছেন। রণজিৎ দাশ-এর প্রখর মুনশিয়ানার মধ্যে যে লাবণ্যের দাপট, বা মৃদুলের যে-ছন্দনিষ্ঠ গতিময়তা, শক্তির স্বাধীন উত্তরাধিকার হিশেবে তাকে ভাবা যেতেই পারে। আশির কবিদের মধ্যে ততটা আর নয়, তারপর নব্বই থেকে শক্তি একেবারে অন্য গ্রহের উচ্চারণ হয়ে আছেন। নব্বই ধরে নিল মাদক, চপল, গীতিকবিতাসুলভ ঘরানা— আমি তখন ছোটোবয়স আমি তখন ফ্রক জাতীয় কবিতার নরম আলস্য বশ করে রাখল নব্বইয়ের কবিতাকে। ছন্দের নানা কুশলী প্রতারণায় সেজে উঠল কবিতা, যা প্রশ্রয় পেল এই সময়ের কিছু মান্য পৃষ্ঠপোষকেরও।

মুশকিল হল, শক্তির কবিতার ভেতরে বাইরে যে- দুরূহ মুখরতা, তার কাছে পৌঁছনোর জন্য অন্য মন দরকার। যে-মন টের পাবে ছন্দের সম্ভাবনা খুলে দিয়েও কবিতার ভেতরের দিকে কীভাবে পদচিহ্নময় সিঁড়ি বানিয়ে তোলা যায় :

মধ্যে নদীর চর জেগেছে, মধ্যিখানে সাঁকো—
থাকো, একটি চরে কেন? দু-চর জুড়েই থাকো।
দু-চর এখন রহস্যময়,
তোমার হাতে অনেক সময়,
থাকো,
মধ্যে নদী, চর জেগেছে, মধ্যিখানে সাঁকো।

এই কবিতায় আবার অনেক কথা পুনরুক্তও হয়েছে। একেই ছোট কবিতা, মাত্র ছ’লাইনের, তার মধ্যে একটি লাইন পুনরাবৃত্ত, একটি শব্দ তিনবার বলা, কবিতার থাকলটা কি আর তাহলে?

যা থাকল, সেটাই যে কবিতা, সেটা বোঝার মতো পাঠক বাংলা কবিতায় কমে এসেছে আমি তা একেবারেই মনে করিনা। সমস্যাটা অন্য কোথাও। এই ছোটোকবিতাটির আসল জোর দু’জায়গায়। একেবারে উলটো দুটি প্রবণতার জোরে লেখাটি উড়াল দিতে পেরেছে। একই সঙ্গে এখানে প্রতিটি শব্দ অবধারিত, একটি শব্দকেও এড়িয়ে যাবার জো নেই; আবার, কিছু শব্দ বারবার বেজে উঠে অতিরিক্ত একটা ঘোর তৈরি করতে পেরেছে । একই সঙ্গে এই দুটি লক্ষ্য সফলভাবে মিলে যাওয়ায় কবিতাটি পড়তে পড়তে বিভ্রান্তির পুলক লাগে মনে, কিছু একটা ঘটছে টের পাওয়া যায়, আর অধরা সম্ভাবনার টানে হাত বাড়িয়ে রাখতে ইচ্ছে হয়।

এই মর্মভেদী রহস্যের বুনন নিয়ে লেখা কবিতা বাংলায় খুব কম নেই। কিন্তু এই কবিতা তো রোজ রোজ পড়া যায় না; খবরের কাগজ আর সাময়িকপত্রের চটজলদি ইশারা আমাদের এমন ব্যস্ত রাখে যে, বাংলা ভাষার শিরোধার্য স্তবকগুলির কাছে ফিরে আসার সময় পাই না আমরা। আর শক্তির এই ধরনের কবিতা তো আমাদের ব্যাকুল আবৃত্তিকারদের শ্লেষ্মার স্পর্শ পায়না। ফলে বাধ্যতামূলক জনপ্রিয়তার কবল থেকে তিনি মুক্ত। তাঁর কবিতার নির্দিষ্ট পাঠক আছে, তাঁদের কাছেই তিনি বারবার নতুনতরভাবে পুনরাবিস্কৃত হবেন।

 

কৃতজ্ঞতা: Kolkata24x7

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত