| 15 এপ্রিল 2024
Categories
সময়ের ডায়েরি

সময়ের ডায়েরি: ইফতারি জার্নাল । মুম রহমান

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট
প্রজন্ম ধরে চর্চিত ওয়াবি-সাবি তত্ত্ব
 
জাপানীদের একটা নন্দনতাত্ত্বিক দিক আমার খুব ভালো লাগে। এমনিতেই আমি জাপানী নন্দনের ভক্ত। বনসাই, ইকেবানা, হাইকু, নো, বুনরাকো আর চা উৎসব নিয়ে কতো কথাই না বলা যায়। আমিও টুকটাক লিখেছি এসব নিয়ে। বাংলাভাষাতেও সামান্য হলো কিছু লেখালেখি আছে। কিন্তু আজ একটা সম্পূর্ণ নতুন দিক নিয়ে কথা বলি। আসলে নতুন নয়, পুরনোই, জাপানের অনেক শিল্প আর নন্দনের মতো ‘ওয়াবি-সাবি’(wabisabi (侘寂)) তত্ত্ব বহু প্রজন্ম ধরে চর্চিত। তবে বাংলাভাষায় বা বাংলাদেশেও এ বিষয়ে কাউকে লিখতে বা বলতে দেখিনি। আজ তবে ওয়াবি-সাবি নিয়ে কথা বলি ইফতারি জার্নালে।
 
যারা খুব উৎকর্ষপ্রেমী, নিঁখুতের সন্ধান করেন সদা তাদের হয়তো ‘অপূর্ণতা’র এই তত্ত্ব ভালোই লাগবে না। কারণ ওয়াবি-সাবি হলো অপূর্ণতার, ত্রুটি বা খুঁতকেই তুলে ধরার দর্শন। মূল দর্শনে যাওয়ার আগে জাপানী একটা প্রবাদ কাহিনী শোনা যাক। সেন নো রিক্যু নামে এক তরুণ ছিলো। সে জাপানের ঐতিহ্যবাহী রীতি রেওয়াজকে নিঁখুতভাবে শিখতে চায়। সে জাপানের চা-গুরু তাকেনো যু’র কাছে গেলো। গুরু তাকেনো যু তরুণ শিষ্য সেন নো’কে বললেন বাগানটা ঝাড়– দিতে। সেন নো খুব করে বাগানটাকে ঝাড়– দিলেন। একটা ময়লাও সেখানে থাকলো না। একটা ঝরা পাতা কিংবা মরা ডালও সেখানে নেই। সব কিছুই নিঁখুত। গুরুকে ডাকবেন নিজের কাজ দেখাতে। তখন কী মনে করে সেন নো চেরি গাছটাকে ঝাঁকুনি দিলেন। আর কিছু ফুল এলোমেলো ঝরে গেলো মাটিতে। ব্যস, এইখান থেকেই শুরু হলো ওয়াবি-সাবি’র চর্চা। সেন নো রিক্যু’র এলেমেলো চেরি ফুলের পড়ে থাকা থেকেই শুরু হলো নতুন এক নন্দন তত্ত্ব তথা সংস্কৃতির চর্চা যার নাম ‘ওয়াবি-সাবি’। খুঁত আর অস্থায়ীত্ব এই হলো ওয়াবি-সাবি’র মূল তত্ত্ব। মূলত বুদ্ধ দর্শনের থেকেই এর উৎপত্তি। একটু বিস্তৃত করে উদাহরণ দেয়ার চেষ্টা করি।
 
মনে করুন আপনার বাড়িতে একটা পুরনো চীনা মাটির বাটি আছে। ধরুন ৭০, ৮০ কিংবা একশ বছরেরই পুরনো। বাটিটি এন্টিক হিসাবেই শুধু মূল্যবান নয়, বরং স্মৃতি হিসাবেও মূল্যবান। আপনার দাদা বা দাদী এই বাটিটি রেখে গেছেন। বংশ পরম্পরায় হয়ে আপনার হাতে বাটিটি এসেছে। আর কে না জানে কাচের বা চীনামাটির বাটিও মানুষের জীবনের মতোই ভঙ্গুর আর অস্থায়ী। এই জানাটুকু সত্যি করতে গিয়ে ঠাস করে বাটিটি আপনার হাত থেকে পড়ে গেলো। এখন আপনি কী করবেন? কাঁদবেন? নিজের উপর রাগ করবেন? ভাগ্যকে দোষ দেবেন? আপনি কী করবেন সেটা আপনার ব্যাপার। কিন্তু জাপানী ওয়াবি-সাবি চর্চাকারী ব্যক্তি বাটিটি হাতে তুলে নেবেন এবং এর ভাঙা টুকরোগুলো জোড়া দেবেন। সেই জোড়া সাধারণ কোন জোড়া নয়। সোনা সঙ্গে আরো কিছু উপাদান মিশিয়ে আঠা তৈরি করে ভাঙা টুকরোগুলোকে এমনভাবে জোড়া দেবেন যে এই বাটিটি দেখতে আরো আকর্ষনীয় মনে হবে। এর ভাঙা টুকরোগুলো আরো সুন্দর হয়ে উঠবে। এই যে ভাঙা জিনিস ফেলে না-দিয়ে তাকে জোড়া দেয়া, তার খুঁতগুলোকে আরো সুন্দর করে দেখা এই বিদ্যাটাকে আবার ‘কিনৎসুগি’ বা ‘সোনালী জোড়’ বলে। প্রায় ৫০০ বছর ধরে এই সোনালী জোড়ের চর্চা হয়ে আসছে। আর ওয়াবি-সাবি’র চর্চা হাজার বছরেরও পুরনো। ফিরে আসি ‘ওয়াবি সাবি’র কথায়। ভাঙা বাটির সৌন্দর্যই হলো ওয়াবি-সাবি। কিনৎসুগি হলো ‘ওয়াবি-সাবি’ চর্চার একটা উদাহরণ।
 
কারণ ওয়াবি-সাবি তত্ত্বের মূল কথা হলো ভঙ্গুর, অসম্পূর্ণ, খুঁতযুক্ত এবং অস্থায়ী জিনিসের মধ্যেও জীবনের সৌন্দর্য খোঁজা। একজন ওয়াবি-সাবি চর্চাকারী বিশ্বাস করেন কোন কিছুই স্থায়ী নয়, নিঁখুত বলে মর্তলোকে কিছু নেই। কাজেই চকচকে, ঝকঝকে বাগানে একটু ঝরা ফুল কিংবা মরা পাতা মর্তলোকের সৌন্দর্যকে তুলে ধরে। আসলে ত্রুটি, খুঁতের মধ্যে সৌন্দর্য আর জীবনের মানে খুঁজে পাওয়াই ‘ওয়াবি-সাবি’। এই সৌন্দর্য দর্শন পাশ্চাত্তের দর্শনের বিপরীত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। পাশ্চাত্ত দর্শনে সুন্দর মানেই সব কিছু নিঁখুত, খুব সাজানো গোছানো, ঝলমলে, মূল্যবান হতে হবে। রঙের জৌলুস, দামের গৌরব, অলঙ্করনের বাহাদুরী না-হলে পাশ্চাত্তে কোন কিছু সুন্দর বলে স্বীকৃতি পায় না। অথচ জাপানী ‘ওয়াবি-সাবি’ দর্শন হলে প্রকৃতির কাছাকাছি, স্বাভাবিক-সরল-সাধারণ থাকার দর্শন। এই সৌন্দর্য দর্শন ব্যক্তির জীবনাচরণেও থাকে। মুশকিল হলো ‘ওয়াবি’ আর ‘সাবি’ শব্দ দুটোর সঠিক অনুবাদও সম্ভব নয়, কারণ এটি সম্পূর্ণই জাপানী নিজস্ব ধারণা। মোটামুটি এটুকু বলা যায় যে ‘ওয়াবি’ হলো সরলতা আর ‘সাবি’ হলো বয়সের সৌন্দর্য।
 

আরো পড়ুন: সময়ের ডায়েরি: ইফতারি জার্নাল(পর্ব-৬)

 
কিছু উদাহরণ দেই। ধরুণ, মাতৃত্ব এটি একটি অপূর্ব গৌরবময় অভিজ্ঞতা। কিন্তু যারা মাতৃত্ব অর্জন করেছেন তাদের পেটে দাগ তৈরি হয়, ইংরেজিতে যাকে প্রেগনেন্সি মার্ক বলে। তো এই পোয়াতির পেটের দাগকে পাশ্চাত্ত ধারণায় অসুন্দর মনে করা হয়। কিন্তু একজন ‘ওয়াবি-সাবি’ দার্শনিকের কাছে এই দাগ মাতৃত্বের সৌন্দর্যের অংশ। যেমন একজন বয়স্ক লোকের পক্ক কেশ কিংবা বলিরেখা তার সৌন্দর্যের অংশ। এই যে বয়সের রেখা এই যে সময়ের রেখা এটাকে রক্ষা করা এবং স্বগৌরবে তুলে ধরাই ‘ওয়াবি-সাবি’র মহিমা। এই পৃথিবীকে খুঁতযুক্ত, অসম্পূর্ণ এবং অস্থায়ী হিসাবে মেনে নিতে হবে এবং তারপর এর গভীরের আদি সৌন্দর্যকে উপভোগ করতে হবে স্বাধীনভাবে- এই হলো ‘ওয়াবি-সাবি’ দর্শনের মূল কথা। এই মূল কথা যদি জীবনে ব্যবহার করা যায় তবে আমাদের জীবন যথার্থ সুন্দর হয়ে ওঠে।
 
ধরা যাক, সম্পর্কের কথাই যদি ধরি। মানুষ হিসাবে আমরা সবাই কম-বেশি ভালো মন্দে মেশানো। এখন প্রিয়জন বা অপ্রিয়জনের দোষ না খুঁজে, তাকে বারবার বদলাতে চেষ্টা না-করে তার খুঁতসহই তাকে যদি আমরা ভালোবাসতে পারি তাহলে প্রিয় সম্পর্কগুলো চিরন্তন সৌন্দর্যের চেহারা পাবে।
 
ধরুন, খাওয়া-দাওয়ার মধ্যেও ‘ওয়াবি-সাবি’ খুঁজছেন আপনি। পেয়ে যাবেন। আপনি নিজে একটা লাউ গাছ বা করল্লা গাছ বা টমোটো গাছ লাগিয়েছেন ছাদে বা বাগানে। সেই লাউ বা করল্লা বা টমেটো হয়তো বাজারেরগুলোর মতো এক আকারের হবে না, দেখতে অতো সুন্দর হবে না। কিন্তু তার স্বাদ আর মানের ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত। কারণ এর যত্ন আত্তি আপনি নিজে করেছেন। এখানে কোন বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য নেই, আপনি এ ফসল ফলিয়েছেন ভালোবাসা দিয়ে। দক্ষতার চেয়ে এখানে আপনার আন্তরিকতা বেশি ছিলো। হোটেলের সাজানো পেশাদার খাবারের চেয়ে ঘরে নিজের বা প্রিয়জনের হাতের বানানো খাবারটি কিংবা শরবতটিই অতি সুন্দর। আর এই সুন্দর খালি ভোগের নয়, উপভোগেরও। আপনি মুখের ভেতরে এই আদরের খাবারের চাবানোর শব্দ, জিভের লালা, খাবারের ঘ্রাণ, রঙ সবকিছুকে উপভোগ করতে পারবেন, চাইলেই। কারণ এখানে ভালোবাসা আছে, আন্তরিকতা আছে। বাজারের রেডিমেড খাবারের পেশাদারি দক্ষতা নয়, একটু ঝাল-নুনের বেশকমও তখন প্রেমময়। এই যে কমতি, এই যে খানিকটা ভুল-ভ্রান্তি এই হলো ‘ওয়াবি-সাবি’।
 
যেমন খানাপিনায় তেমনি নিজের বসবাস কিংবা ঘরসাজানোতেও ‘ওয়াবি-সাবি’ রক্ষা করা সম্ভব। ধরুণ আপনি ইট দিয়ে ঘর বানিয়েছেন। সচারাচর কী করেন? এই ইট ঢেকে দেন। পলেস্তরা করেন, রঙ করেন। কিন্তু একজন ‘ওয়াবি-সাবি’ চর্চাকারী ইটের দেয়ালটিকে ঢাকবেন না, বরং এই গাঁথুনির সৌন্দর্যকেই উপভোগ করবেন, করাবেন। আপনার পুরনো ফার্নিচারের ড্রয়ারের হয়তো হাতলটি নেই, না থাকুক। এই না-থাকাকে দামী আর আধুনিক একটা হাতল দিয়ে ঢাকার দরকার নাই। এর অনুপস্থিতিই আপনাকে মনে করিয়ে দেবে বস্তুর নিত্যতার কথা। নতুন, আধুনিক নকশার যে কোন একটা ফার্নিচার তো টাকা দিলেই দোকান থেকে কিনে আনা যায়। কিন্তু নিজের মা-বাবার ব্যবহার করা পুরনো স্টিলের আলমারিটিকে যদি সংরক্ষণ করা যায় তবে স্মৃতিও সংরক্ষিত হয়, পুরনোর রূপটিও স্বমহিমায় ধরা পড়ে। ‘ওয়াবি-সাবি’তে তাই খুব রঙচঙা জিনিসের চেয়ে মাটি নিকটবর্তী রঙ কিংবা সাধারণ ধূসর, একটু তামাটে, প্রকৃতির সবুজ কিংবা পুরনো হয়ে যাওয়া মরিচা ধরা রঙের গুরুত্ব বেশি।
 
রূপচর্চাকারীরা নিশ্চয়ই এতোক্ষণে এটা বুঝে ফেলেছেন একগাদা মেকআপের গুরুত্ব ওয়াবি-সাবিতে নেই। বয়সের ভাঁজ, বলিরেখা ঢেকে রাখা এক ধরণের প্রতারণাই। শিশুর কোমল চামড়ার যেমন একটা সৌন্দর্য আছে বৃদ্ধের বলিরেখারও তেমনি একটি নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। বিজ্ঞাপণ দেখে জিরো ফিগার হতে চাওয়া, ফর্সা হতে চাওয়ার মধ্যে অন্তত নিজের ব্যক্তিত্বের রূপকে ফুটিয়ে তোলা যাবে না। যার যা ব্যক্তিত্ব, যে বয়সের, যে জাতির যে সৌন্দর্য তাই তুলে ধরতে হবে। চীনা-জাপানীরা বেটে, আফ্রিকানরা কালো, আমরা তামাটে, খানিকটা মোটা গড়নেরÑ এই তো যার যার সৌন্দর্য। কেন ইউরোপীয় বা আমেরিকানদের মতো ফর্সা আর পেটানো শরীরেরই হতে হবে? চুলে কলপ না দিয়ে, মুখে রঙ ফর্সা করার ক্রিম না-দিয়ে বরং নিজেকে পরিচ্ছন্ন, সুস্থ্য রাখাই হলো ‘ওয়াবি-সাবি’র সৌন্দর্য দর্শন।
 
এমনকি আপনি নিজের কর্মস্থলেও ‘ওয়াবি-সাবি’ দর্শনের চর্চা করতে পারেন। নিজেকে জোর করে স্মার্ট বানানো, নিজের ভুলকে আড়াল করার নিরন্তর চেষ্টা না-করে, নিজের ভুলকে স্বিকার করুন, নিজের ক্ষমতা ও অক্ষমতাকে আপনার কাজের ক্ষেত্রে নির্দিদ্ধায় প্রকাশ করুন। অন্য কেউ আপনার আদর্শ নয়, হতে পারে না। আপনি যা, আপনি তাই। নিজেকেই কর্মে আরও আন্তরিক করুন, নিবিষ্ট করুন। তবেই আপনার কাজের ‘খুঁত’ও সুন্দর হয়ে উঠবে। যে খোঁড়া, যে অন্ধ সে কি তার অক্ষমতা ঢাকতে ব্যস্ত হবে নাকি নিজের অক্ষমতা সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্র সৎ থেকে এগিয়ে যাবে। হয়তো এই এগিয়ে যাওয়া পেশা জগতের অসুস্থ দৌঁড়ের সাথে পাল্লা দেয়া হবে না। কিন্তু জীবনে আর কাজে তো সুখ আসবে, শান্তি আসবে। এই সুখ শান্তিই শেষ পর্যন্ত ‘ওয়াবি-সাবি’র সবচেয়ে বড় পুরস্কার। যে আপাত অসুন্দর আর আপত ভুলের মধ্যেও ভালোবাসা খুঁজে পায় তার জীবনে কি সুখ-শান্তির অভাব হয়।
 
সুখে থাকুন, শান্তিতে থাকুন। এই নশ্বর জীবনে সেটাই দরকারী।
ভালোবাসা।
 
 
 
 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত